মাল্যদান

বাংলাদেশের ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের জয়ের পরে দেশের বাইরে চলে যাওয়া প্রায় ৮০ লক্ষ এবং দেশের ভিতরে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ধাবমান আরও ৮০ লক্ষ শরণার্থী নর-নারী-শিশুর নিজের নিজের ঘরে ফেরার পালা। হিসেব করতে গিয়ে দেখা গেলো, যারা ফিরবে না তাদের সংখ্যা কয়েক লক্ষ। যারা ঘরে ফিরে এলো তারা দেখলো যাদের রেখে গিয়েছিলো, তাদের মধ্যেও অনেকে নেই।

পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনীর মধ্যে থেকে বাছাই করা হিংস্র লোকদের নিয়ে গঠিত হানাদারদের বাহিনী ও স্থানীয় মুসলিম লীগ আর জামাতের বন্দুকধারী রাজাকাররা গ্রামের পরে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা সমেত অসংখ্য নর নারী শিশুকে নদীর ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা চরগুলোর বিরান এলাকায় জড়ো করে খুন করেছিল। প্রায় প্রত্যেকটা মহকুমায় কয়েকটা করে বধ্যভূমি তৈরী হয়েছিল।

স্বাধীনতার ঠিক পরেই এই বধ্যভূমিগুলোতে নিখোঁজদের চিহ্নের খোঁজ করা হলো। পরে এই বধ্যভূমিগুলো হলো শহীদভূমি।

যে ঘটনাটার কথা এখানে বলছি, সেটা এই রকমের একটা বধ্যভূমি নিয়ে। ঘটনাটা অবশ্য স্বাধীনতার পরের বছরের। ঝালকাঠিতে একটা ছাত্র সম্মেলনে যোগ দিতে গেলেন ঢাকা থেকে অধ্যাপক কামাল ৷ প্রধান অতিথি হিসেবে। স্টিমারে ঢাকা থেকে লম্বা পথ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্টেনগান কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এবং ছিলেন ধলেশ্বরীর ধার ঘেঁষে এক গণ্ডগ্রামে। মাঝে মাঝে লঞ্চ নিয়ে দখলদার বাহিনীর লোকেরা গঞ্জে গঞ্জে হানা দিতো। তাদের সঙ্গে দু-একটা খণ্ডযুদ্ধ করেছিলেন অধ্যাপক কামাল। কিন্তু কলেজ ও স্কুলের কয়েকটি ছেলেকে দখলদার বাহিনীর লঞ্চের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ঝোঁক থেকে ঠেকিয়ে রাখতে হয়েছে তাঁকে। কয়েকটি ছেলে মুক্তিযোদ্ধাদের এই ছোট দলটিকে সাহায্য করতো। দরকার হলে নৌকা বাইত ৷ এদের সবাইকে নিয়ে বিচ্ছিন্ন গ্রাম এলাকায় একটা সংসারের মতো পেতেছিলেন তিনি। বিপ্লবের দর্শন নিয়ে আলোচনা করতেন। বই পড়াতেন ৷

ঝালকাঠির পথে স্টিমারের লম্বা নদীপথে ডেকে দাঁড়িয়ে দূর-দূরান্তরের গাছপালায় ঢাকা অসংখ্য গ্রামকে কল্পনার চোখে দেখে অধ্যাপক কামালের মনে হচ্ছিল, মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনটা খুব দীর্ঘ। ধলেশ্বরীর কিনারা থেকে এতটা বুঝতে পারা যায়নি। এবার ফিরে গিয়ে রণাঙ্গনের বিস্তৃতির ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা যাবে গ্রামের সবাইকে, এমনকি ঢাকাতেও বলা যাবে। ছেলেমেয়েরা কোথায় কি করেছে তার একটা হিসাব পেশ করা যাবে ৷

ঝালকাঠি সন্ধ্যা নদীর ধারে একটা বন্দর। এখানে একটা কলেজ আছে। খুলনা আর বরিশালের যোগসূত্র এখানে। ছাত্র আন্দোলনের নাম আছে। নদীর ধারের কলেজে নদীর কোলে আশৈশব লালিত ছেলেদের গুঞ্জনে ঝড়ো ঢেউ ওঠে, উর্মিলতাও রয়েছে। হাজার খানেক তরুণ-তরুণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয়ের সুযোগ পেয়েছেন অধ্যাপক কামাল ৷

গভীর রাতে জেটিতে স্টিমার ঠেকলে সিঁড়ি নামানোর পরে ছাত্ররা তাঁকে প্রায় শূন্যে তুলে নামালো, তাদের ধারণা, ঢাকার অধ্যাপক আর বুদ্ধিজীবীরা ঝালকাঠিকে গেঁয়ো মনে করে। স্টিমারটার ব্যবহারও অনেকটা নৌকার মতো। ওঠানামা করার সমস্ত দায়িত্ব যাত্রীদের।

সুতরাং সেই রাতে অধ্যাপক কামাল ঝালকাঠির আর কিছু দেখতে পেলেন না ৷

সকাল আটটায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হলো তাঁকে। একটি ছোট বক্তৃতা করলেন। এরপরে ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই লাইন করে দাঁড়ালো। অধ্যাপক কামালকে লাইনের মাথায় গিয়ে দাঁড়াতে হলো।

একটি ছেলে বিনীতভাবে বললো, স্যার, এখন আমরা বধ্যভূমিতে যাবো। সেখানে একটি স্মৃতিফলক আছে। তাতে আপনি মালা দেবেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় লঞ্চ থেকে নেমে হানাদার বাহিনী বন্দরে যাকে সামনে পেত পুরুষ, মেয়ে ও শিশু নির্বিশেষে ধরে নিয়ে এই বধ্যভূমিতে দাঁড় করিয়ে গুলী করে মারতো। ৭২ এর প্রথম দিকে কঙ্কাল আর খুলির মধ্যে পাগলের মতো বন্দরের মানুষ তাদের আপনজনকে খুঁজেছে। নিয়েও গিয়েছে অনেকে আন্দাজ করে মাথার খুলি। আজ একেবারে পরিষ্কার।

ঝালকাঠি বন্দরটাকে প্রায় সর্বাংশে পেরিয়ে দীর্ঘপথ ধরে অধ্যাপক কামাল গিয়ে পৌঁছলেন বধ্যভূমিতে। দেখলেন সন্ধ্যা নদীর ধারে একটা চর। হু হু হাওয়া। এরই

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice